হিংসা: মানুষের অন্তর্গত অদৃশ্য অগ্নি


 




মানুষের মন বড় বিস্ময়কর। বাইরে আমরা যতই স্বচ্ছ, শান্ত কিংবা নির্লিপ্ত দেখাই না কেন—অন্তরে লুকিয়ে থাকে বহু চঞ্চল তরঙ্গ। সেই তরঙ্গগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অস্থির, সবচেয়ে তীক্ষ্ণ আর সবচেয়ে অদৃশ্য যে অনুভূতি, তার নাম হিংসা। হিংসা কখনো ঝড়ের মতো আসে না; আসে শিশিরের মতো নীরবে। কিন্তু সেই শিশিরের ফোঁটাই হয়ে ওঠে আগুন—অন্তরকে শুকিয়ে দেয়, দগ্ধ করে নিজের অস্তিত্বকেই।

হিংসার জন্ম খুব সাধারণ জায়গা থেকেই। কারো সাফল্যে, কারো হাসিতে, কারো সহজ প্রাপ্তিতে হঠাৎই মন প্রশ্ন তোলে—“সে পারে, আমি কেন পারি না?” এই প্রশ্নই হয় হিংসার প্রথম বীজ। যাকে আমরা অন্যের সাফল্য ভাবি, তা হিংসুক মানুষের চোখে নিজের ব্যর্থতার আয়না হয়ে দাঁড়ায়। একসময় সেই আয়নায় নিজের মুখ দেখতে ইচ্ছে করে না, বরং অন্যের মুখ ভাঙতে ইচ্ছে করে। অথচ সাফল্য তো কারও দয়ার দান নয়—পরিশ্রমের ফল, সময়ের দান, ভাগ্যের ছোঁয়া। কিন্তু হিংসা এই সহজ সত্যগুলো দেখতেই দেয় না।

হিংসা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে হিংসুক মানুষকেই। যে হৃদয়ে হিংসা জন্মায়, সে হৃদয়ে শান্তি দীর্ঘদিন থাকে না। সে অন্যের সুখ দেখে অশান্ত হয়, অন্যের সম্মান দেখে ব্যথিত হয়, আর নিজের জীবনকে সবসময় কম মনে করে। হিংসা মানুষকে নিজের অর্জন ভুলিয়ে দেয়, দেয়ালের ফাটলকে এমন বড় করে দেখায়—যেন পুরো বাড়িটাই ভেঙে পড়বে। এতে অন্যের কিছু যায় আসে না, কিন্তু নিজের ভেতরকার আলো নিভে যেতে থাকে খুব ধীরে, খুব নিঃশব্দে।

হিংসা সম্পর্ককেও বিষাক্ত করে তোলে। সম্পর্ক তো বিশ্বাসের উপর দাঁড়ানো একটি কোমল বৃক্ষ, আর হিংসা তার শেকড়ের নিচে রাখা এক মুঠো বিষ। ধীরে ধীরে তা শেকড় চুষে নিতে থাকে। বন্ধুত্বে ফাটল ধরে, সহকর্মীর প্রতি অবিশ্বাস জন্মায়, আত্মীয়তার ভেতরে অকারণ শত্রুতা ঢুকে পড়ে। অথচ সত্যিকারের ভালোবাসা আর বন্ধুত্বের জায়গায় হিংসার কোনো স্থান নেই। কারণ হিংসা আসে সংকীর্ণতা থেকে, আর ভালোবাসা আসে উদারতা থেকে।

আশ্চর্যের বিষয়—হিংসা দূর করা কঠিন নয়। মানুষের মন যদি চায়, হিংসা গলে জল হয়ে যাবে। যে মানুষ নিজের পথ বুঝে নেয়, নিজের সময়কে মূল্য দেয়, নিজের সাফল্যকে ছোট ভাবা বন্ধ করে—তার হৃদয়ে হিংসার জায়গা থাকে না। অন্যের সাফল্য তার কাছে হয়ে ওঠে অনুপ্রেরণা; অন্যের সুখ হয়ে ওঠে আশীর্বাদ। কারণ যে সত্যি বোঝে, সে জানে—পৃথিবীতে কারো পথই কারোর মতো নয়। প্রত্যেকের দৌড়ের লাইন আলাদা, আর প্রত্যেকের শেষবিন্দু আলাদা।

হিংসা আসলে হৃদয়ের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়। যে মানুষ অন্যের সুখ দেখে নিজেকে দগ্ধ হতে দেয় না, যে নিজের উন্নতির জন্য নিজের মধ্যেই আলো খোঁজে—তারাই সত্যিকারভাবে মুক্ত মানুষ। তাদের চোখে পৃথিবী সুন্দর, মানুষ আশীর্বাদ, সাফল্য ভাগাভাগি করার আনন্দ। আর যে অন্তর হিংসামুক্ত, সে অন্তরই সবচেয়ে নির্মল, সবচেয়ে শান্ত, সবচেয়ে সমৃদ্ধ।

মানুষের জীবনে কত অনুভূতিই আসে, যায়—কিন্তু কিছু অনুভূতি সংগ্রহে রাখা যায় না। হিংসা তারই একটি। হিংসা পরিত্যাগ করলে মানুষ নিজের ভেতর যে আলো খুঁজে পায়, তা অন্য কেউ নিভিয়ে দিতে পারে না। কারণ হিংসা থেকে মুক্ত মানুষই প্রকৃত অর্থে পূর্ণ মানুষ; নিজের প্রতি, অন্যের প্রতি এবং সৃষ্টির প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল মানুষ।



Post a Comment

0 Comments